বাগান বিলাস (Bougainvillea) ছাদবাগান বা বাড়ির আঙিনায় সৌন্দর্য বর্ধনকারী একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ফুল। অনেকেই বাগান বিলাস ফুল গাছের নতুন চারা তৈরি করতে চান । চারা তৈরির বেশ কয়েকটি পদ্ধতি থাকলেও ‘শলা কলম পদ্ধতি’ বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। এই আর্টিকেলে বাগান বিলাস ফুলের শলা কলম পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় উপকরণ, ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
শলা কলম পদ্ধতি কী ?
শলা কলম হলো গুটি কলমের একটি পরিবর্তিত পদ্ধতি। এতে ডাল সম্পূর্ণ ছাল ছাড়ানো হয় না; বরং গিঁটের নিচে V-আকৃতিতে কেটে তার মধ্যে একটি ছোট শলা বা কাঠের টুকরা বসানো হয়। এরপর মাটির মিশ্রণ দিয়ে ঢেকে দিলে ওই অংশে নতুন শিকড় গজায়। এই পদ্ধতিতে ডালের কাটা অংশ দুটি আলাদা রাখতে নারিকেলের পাতার শলা বা ছোট কাঠের টুকরা ব্যবহার করা হয়। এই “শলা” ব্যবহারের কারণেই একে শলা কলম বলা হয়।
এই পদ্ধতির সুবিধা
- দ্রুত নতুন চারা তৈরি করা যায়
- মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থাকে
- ফুল ধরার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না
- সফলতার হার অনেক বেশি
- নবীন বাগানপ্রেমীরাও সহজে করতে পারেন
শলা কলম করার উপযুক্ত সময় :
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বাগান বিলাস ফুল গাছের শলা কলম করার উপযুক্ত সময়: ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ; জুন – সেপ্টেম্বর । এই সময়ে গাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং শিকড় গজানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে।
কলম করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ
- ধারালো ছুরি বা ব্লেড
- দোঃআশঁ মাটি বা এঁটেল দোঃআশঁ মাটি
- গোবর সার বা জৈব সার
- পলিথিন
- সুতা বা কেবল টাই
বাগান বিলাস ফুল গাছের শলা কলম করার ধাপসমূহ
ধাপ ১: সঠিক ডাল নির্বাচন
প্রথমে মাতৃগাছের এমন একটি ডাল নির্বাচন করুন যেটি খুব বেশি কচি নয়, আবার খুব বেশি পুরনোও নয়। পেন্সিলের চেয়ে কিছুটা মোটা, মাঝারি বয়স্ক এবং সতেজ ডাল কলম করার জন্য সবচেয়ে ভালো।
ধাপ ২: ডাল প্রস্তুতকরণ
কলম করার জন্য ডালের একটি গিঁট বাছাই করে নিতে হবে। ডালের যেখান থেকে পাতা ও কাঁটা বের হয় তাকে গিঁট বলা হয়। গিঁটের আশেপাশে থাকা পাতা ও কাঁটা পরিষ্কার করে নিতে হবে।
ধাপ ৩: ডাল চির করে কেটে নেওয়া
গিঁটের নিচ দিয়ে ডালের উপরের দিকে মাঝ বরাবর কিছুটা অংশ চির করে কেটে নিতে হবে। ইংরেজি অক্ষর “V” এর মতো চির করে নিতে হবে।
ধাপ ৪: শলা বা কাঠের টুকরা প্রবেশ
নারিকেলের পাতার শলার একটি ছোট টুকরা বা কাঠের ছোট টুকরা কাঁটা স্থানে বসিয়ে দিতে হবে। যাতে করে ডালের কাটা অংশ দুটি কিছুটা ফাঁকা হয়ে থাকে। ধাপ ৫: মাটির মিশ্রণ তৈরি ও প্রয়োগ দোআঁশ মাটি বা এঁটেল দোআঁশ মাটির সাথে কিছু পরিমাণ জৈব সার মিশিয়ে পানি দিয়ে আঠালো মণ্ড বা দলা তৈরি করুন। এরপর ডালের যে অংশে কাটা হয়েছে, সেখানে মাটির দলাটি ভালোভাবে চারপাশ দিয়ে লাগিয়ে দিন।
ধাপ ৬: পলিথিন দিয়ে বাঁধা
মাটির দলাটি যেন শুকিয়ে না যায় বা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে না যায়, সেজন্য একটি পরিষ্কার পলিথিন দিয়ে মাটির অংশটি সম্পূর্ণ মুড়িয়ে দিন। এরপর সুতলি বা রশি দিয়ে পলিথিনের দুই প্রান্ত শক্ত করে বেঁধে দিন ।
ধাপ ৭: শিকড় গজানোর অপেক্ষা
সাধারণত ৩০-৪০ দিনের মধ্যে কলমে শিকড় চলে আসে। পলিথিনের বাইরে থেকে সাদাটে বা খয়েরি রঙের শিকড় দেখা যায়।
ধাপ ৮: নতুন চারা আলাদা করা ও রোপণ
যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে শিকড় তৈরি হবে, তখন কলমের নিচের অংশ থেকে ডালটি কেটে নিন। এরপর পলিথিন ছাড়িয়ে টবে বা জমিতে রোপণ করুন।
Garden Science Tip- পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়ার ফলে সাধারণত মাটি শুকিয়ে যায় না। যদি কোন কারণে মাটি শুকিয়ে যায় সেক্ষেত্রে পলিথিন না খুলে, একটি ইনজেকশন সিরিঞ্জ দিয়ে পানি পুশ করে দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে।
নতুন চারার পরিচর্যা
শলা কলম থেকে তৈরি চারার সঠিক পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা না হলে চারা মারা যেতে পারে। প্রথম ১০–১২ দিন অবশ্যই ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন। নিয়মিত পানি দিয়ে মাটি সব সময় হালকা আর্দ্র রাখুন। সরাসরি প্রখর রোদ এড়িয়ে চলুন। নতুন কুঁড়ি দেখা দিলে ধীরে ধীরে চারাটিকে রোদে অভ্যস্ত করুন।
সাধারণ ভুলসমূহ
- খুব কচি ডাল নির্বাচন করা
- গিঁটের নিচ থেকে ডাল চির না করা
- শুকনো মাটি ব্যবহার করা
- অল্প শিকড় থাকা অবস্থায় কলম কেটে ফেলা
- রোপণের পর সরাসরি রোদে রাখা
বিস্তারিত জানতে ভিডিও দেখুন
প্রবন্ধ পড়ে পদ্ধতিটি সম্পর্কে ধারণা পেলেও, বাস্তব কাজ দেখার মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হওয়া যায়। কীভাবে সম্পূর্ণ প্রসেসটি হাতে-কলমে করা হয়েছে, তা বিস্তারিত দেখতে নিচের ভিডিওটি প্লে করুন:
বাগান বিলাস ফুল গাছের শলা কলম পদ্ধতি হলো দ্রুত, সহজ এবং অত্যন্ত সফল একটি চারা তৈরির কৌশল। সঠিকভাবে ধাপগুলো অনুসরণ করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন চারা পাওয়া সম্ভব। যারা ছাদ বাগান বা শৌখিন বাগান করেন, তাদের জন্য এই পদ্ধতি একটি কার্যকর উপায়।
কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর – (FAQ)
১. শলা কলমে কত দিনে শিকড় বের হয়?
সাধারণত অনুকূল আবহাওয়ায় ৩০–৪০ দিনের মধ্যে শিকড় বের হয়। তবে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, ডালের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে কিছু ক্ষেত্রে ৪৫–৬০ দিনও লাগতে পারে।
২. শীতকালে শলা কলম করা যায়?
শীতকালে শলা কলম করা যায়, তবে সফলতার হার তুলনামূলকভাবে কম। কারণ এ সময় গাছের বৃদ্ধি ধীর থাকে এবং শিকড় গজাতে অনেক সময় লাগে।
৩. বাগান বিলাস গাছে শলা কলমে রুটিং হরমোন ব্যবহার জরুরি?
না, রুটিং হরমোন ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। সঠিকভাবে শলা কলম করলে সাধারণত রুটিং হরমোন ছাড়াই ভালোভাবে শিকড় গজায়। তবে দ্রুত ও শক্তিশালী শিকড় গঠনের জন্য চাইলে রুটিং হরমোন ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪. একই গাছে কয়টি শলা কলম করা যায়?
এটি গাছের আকার ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। সুস্থ ও পরিণত একটি লম্বা ডালে একসঙ্গে ৩-৬ টি শলা কলম করা যায়। তবে খুব বেশি কলম করলে মাতৃগাছের ওপর অতিরিক্ত চাপ পরতে পারে।
