সুস্থ ও সবল চারা তৈরির প্রথম কাজ হলো সঠিকভাবে বীজের অঙ্কুরোদগম করানো। অনেকেই ভালো মানের বীজ ব্যবহার করেও ভুল পদ্ধতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পান না। এই আর্টিকেলে টিস্যু পেপার, মাটি এবং কোকোপিট – এই ৩টি পরীক্ষিত পদ্ধতি ধাপে ধাপে দেখানো হয়েছে, যাতে বীজ থেকে সফলভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক চারা উৎপাদন করা যায়।
বীজের অঙ্কুরোদগম পূর্ব গুরুত্বপূর্ণ কাজ
প্রথমত পুষ্ট ও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা সম্পন্ন বীজ বাছাই করে নিতে হবে । এরপর বীজ গুলো অল্প সময় মাঝারি তাপের রোদে রেখে দিতে হবে। রোদে দিলে বীজের সুপ্ত অবস্থা ভেঙে যায়। তবে সব বীজের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয় এবং অতিরিক্ত রোদে রাখা উচিত নয়। তারপর ৮-১২ ঘন্টা (বীজ অনুযায়ী সময় ভিন্ন হয়) পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে।
বীজ জার্মিনেশন/বপন এর আগে শোধন করে নেওয়া দরকার। বীজে কিছু জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায়। এগুলো বীজের অংকুর বের হলে বা ছোট চারা গাছ অবস্থায় সক্রিয় হয়ে আক্রমণ করে।
বীজ শোধন পদ্ধতি-
- প্রথমে বীজ নির্ধারিত সময় পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
- ভিজানো শেষ হলে পানি ভালোভাবে ঝরিয়ে ফেলুন।
- বীজ ছায়ায় কিছুক্ষণ রেখে শুধু বাইরের অংশ শুকিয়ে নিন।
- এরপর কিছু পরিমাণ কার্বেনডাজিম ছত্রাকনাশক পাউডার বীজের সাথে মিশিয়ে নিন (পণ্যের লেবেলে উল্লেখিত নির্দেশনা ও মাত্রা দেখুন)।
- এরপর যত দ্রুত সম্ভব বীজ বপন করুন।
বীজ শোধন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত জানুন
Garden Science Tip – বাজার থেকে কেনা প্যাকেটজাত বীজ গুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শোধন করা থাকে। খোলা বীজ অবশ্যই শোধন করে নিতে হবে ।
টিস্যু পেপার পদ্ধতিতে বীজ অঙ্কুরোদগম
নতুন বাগানিদের জন্য এই পদ্ধতি বেশ উপযোগী । টিস্যু পেপার দিয়ে বীজ জার্মিনেশন অত্যন্ত সহজ এবং জার্মিনেশন স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করা যায়। এজন্য বীজ জার্মিনেশন রেট পরীক্ষা করার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
শীতের সময় তাপমাত্রা ও আদ্রর্তা সঠিক মাত্রায় না থাকায়, বীজ অঙ্কুরোদগমে সমস্যা হয়। এর একটি সমাধান হলো টিস্যু পেপার পদ্ধতিতে বীজ জার্মিনেশন।
পদ্ধতির ধাপসমূহ –
- বীজ গুলো ৮-১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। বীজের আকার ও খোলসের পুরুত্বের উপর ভিত্তি করে এই ভিজিয়ে রাখার সময় কম বেশি করতে হবে
- পানি থেকে বীজ গুলো তুলে অতিরিক্ত পানি ঝরিয়ে নিতে হবে
- একটা ঢাকনা সহ বায়ুরোধী বক্স (Air tight box) নিতে হবে
- বক্স এর তলায় এক স্তর টিস্যু পেপার বিছিয়ে দিয়ে, স্প্রে করে পানি দিয়ে বা ফুটায় ফুটায় পানি দিয়ে পেপার টি ভিজিয়ে দিতে হবে।
- টিস্যু পেপার এর উপর বীজ গুলো বিছিয়ে নিতে হবে এবং আরোও এক স্তর ভেজা টিস্যু পেপার দিয়ে বীজ গুলো ঢেকে দিতে হবে
- তারপর বক্স টি ১-২ ঘন্টা হালকা রোদে রেখে দিতে হবে
- রোদে দেওয়ার পর বক্স টি ঘরের অন্ধকার-শুষ্ক জায়গায় রেখে দিতে হবে। এক্ষেত্রে রঙিন কাপড় বা পেপার দিয়ে বক্স টি ঢেকে দেওয়া যেতে পারে
- ২-৩ দিন পর (কি ধরনের বীজ, এর উপর সময় নির্ভর করবে), বক্স এর ঢাকনা স্বচ্ছ হলে বাইরে থেকে দেখেই বুঝা যাবে বীজ অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে কিনা
- টিস্যু পেপার এর পানি শুকিয়ে গেছে কিনা তা দেখতে হবে। পানি শুকিয়ে গেলে আবার স্প্রে করে পানি দিতে হবে।
- ৪০-৫০ শতাংশ বীজ জার্মিনেট হয়ে গেলে সবগুলো বীজ সংগ্রহ করে নিতে হবে
পরে কাঙ্ক্ষিত পাত্র বা বীজতলার মাটিতে সামান্য গর্ত করে বীজ গুলো রেখে দিয়ে, অল্প মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। অতঃপর ১-২ দিনের মধ্যে চারা বের হওয়া আরম্ভ হবে। অঙ্কুরোদগম করা বীজ থেকে চারা হওয়ার সম্ভাবনা ৯৫% এর বেশি।
Garden Science Tip – বীজ থেকে শিকড় (অংকুর) বের হওয়া মাত্রই বীজ গুলো বীজতলায়/মাটিতে বপন করে দেওয়া উচিত। কারণ, অংকুর বেশি বড় হয়ে গেলে তখন বপন করলে দুর্বল চারা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যেসব বীজ টিস্যু পেপার পদ্ধতিতে জার্মিনেট করা যাবে
- শাক- কলমি শাক, পুঁই শাক
- সবজি- মরিচ, টমেটো, বেগুন, শসা, শীম, লাউ, করলা, কুমড়া ইত্যাদি
- ফুল- সূর্যমুখী, মরু গোলাপ (Adenium), অপরাজিতা, সন্ধ্যামালতি, ক্যালেন্ডুলা, দোপাটি ইত্যাদি
- ফল- লেবু, কমলা, খেজুর, আপেল ইত্যাদি
অর্থাৎ- অতি ক্ষুদ্র বীজ যেমন- লালশাক, ডাটা শাক, পাট শাক, ফুলকপি, ক্ষুদ্র ফুল বীজ এবং বড় আকারের বীজ যেমন- আম,লিচু এই পদ্ধতির জন্য উপযোগী নয়।
মাটিতে বীজ অঙ্কুরোদগম
এই পদ্ধতিতে সাধারণ ভাবে মাটিতে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। তবে এর জন্য মাটি বিশেষ ভাবে তৈরি করে নিতে হয়। মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব উপাদান মেশাতে হয়। এই পদ্ধতিতে যেকোনো ধরনের বীজ অঙ্কুরোদগম করা যাবে।
পদ্ধতির ধাপসমূহ –
- মাটি তৈরি ৪০% দোঃআঁশ মাটি + ৩০% কোকোপিট + ৩০% গোবর কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্ট একসাথে মেশাতে হবে। উপাদান গুলো ভালো করে মিশিয়ে কড়া রোদে রেখে শুকিয়ে নিতে হবে।
- বীজ গুলো ৮-১২ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে (বীজ অনুযায়ী সময় ভিন্ন হয়)
- কম গভীরতার চওড়া সাইজের পাত্র নিতে হবে, মাটির পাত্র হলে সবচেয়ে ভালো হয়। পূর্বে তৈরি করা মাটি মিশ্রণ দ্বারা পাত্র পূরণ করে নিয়ে, অল্প পানি স্প্রে করে মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে
- তারপর মাটিতে অল্প গর্ত করে বীজ গুলো গর্তে দিয়ে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে (বড় বীজ এর জন্য)। আর ছোট সাইজের বীজ মাটিতে ছিটিয়ে দিয়ে অল্প মাটি দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে
- আবার পানি প্রয়োগ করে মাটি ভালো করে ভিজিয়ে দিতে হবে
- তারপর পাত্র কালো রং এর পলিথিন বা খবরের কাগজ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এভাবে ঢেকে দেওয়ার কারণে সঠিক আদ্রর্তা বজায় থাকে।
- এর পর পাত্র খোলা জায়গায় রাখা যাবে না এবং বৃষ্টিতে ভেজানো যাবে না। কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় রেখে দিতে হবে।
- ৩-৪ দিন পরে দেখতে হবে বীজ জার্মিনেট হলো কিনা। মাটি শুকিয়ে গেলো কিনা সেটাও দেখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পানি দিতে হবে।
অধিকাংশ বীজ জার্মিনেট হয়ে গেলে পাত্রের ঢাকনা সরিয়ে ফেলতে হবে এবং পাত্রটিকে আলো বাতাস পূর্ণ স্থানে রাখতে হবে। তারপর চারা বড় হওয়ার উপর ভিত্তি করে রোদের সময়কাল বৃদ্ধি করতে হবে। প্রথম ২–৩ দিন তীব্র দুপুরের রোদে রাখা যাবে না।
মাটি বিহীন কোকোপিটে বীজ অঙ্কুরোদগম পদ্ধতি
কোকোপিটে বীজের জার্মিনেশন হার মাটির চেয়ে বেশি। কারণ, কোকোপিট স্বাভাবিক ভাবে ছত্রাকরোধী ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও মাটির চেয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা বেশি। এসব কিছু বীজ অঙ্কুরোদগমে অধিক সহায়তা করে।
এই পদ্ধতিতে মাটির পরিবর্তে কোকোপিট ব্যবহার করা হয়। তবে ১০০% কোকোপিট ব্যবহার করা যাবে না। কোকোপিট এর সাথে ২০-৩০% হারে গোবর কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্ট সার মেশাতে হবে।
কোকোপিট+ভার্মি কম্পোস্ট মিক্স মিডিয়া তৈরি করে নেওয়ার পর বাকি কাজ কর্ম সব “মাটি দিয়ে বীজ জার্মিনেশন পদ্ধতির মতো”।
Garden Science Tip- বাড়িতে বানানো কোকোপিট হলে অবশ্যই প্রসেস করে/পঁচিয়ে নিতে হবে। প্রসেস করার জন্য ৭-১০ দিন পানিতে রেখে পঁচিয়ে নিতে হয়।বাজার থেকে কেনা কোকোপিট প্রসেস করা কিনা তা জেনে নিতে হবে।
পদ্ধতি গুলোর তুলনা
| পদ্ধতি | সফলতার হার | খরচ | নতুনদের জন্য |
| টিস্যু পেপার | ⭐⭐⭐⭐⭐ | কম | ✔✔✔ |
| মাটি | ⭐⭐⭐⭐ | কম | ✔✔ |
| কোকোপিট | ⭐⭐⭐⭐⭐ | মাঝারি | ✔ |
সঠিক বীজ নির্বাচন, উপযুক্ত মাধ্যম এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতা নিশ্চিত করতে পারলে অধিকাংশ বীজ থেকেই সুস্থ ও সবল চারা উৎপাদন করা সম্ভব। আপনার সুবিধা ও বীজের ধরন অনুযায়ী টিস্যু পেপার, মাটি বা কোকোপিট—যেকোনো একটি পদ্ধতি বেছে নিন। সঠিক পরিচর্যা করলে বীজ থেকে সফল চারা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর – (FAQ)
১. কতদিনে বীজ অঙ্কুরিত হয়?
উত্তর: বীজের ধরন, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বীজের মানের উপর অঙ্কুরোদগমের সময় নির্ভর করে। সাধারণত সবজি ও ফুলের অধিকাংশ বীজ ৩–১০ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়।
২. কোকোপিট এর পরিবর্তে কাঠের ভুসি বা কোকোপিট এর সাথে কাঠের ভুসি মেশানো যাবে?
উত্তর: কাঠ চিরার করাত কল থেকে সংগৃহীত কাঠের ভুসি কোকোপিট এর সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা যাবে না। কাঠের ভুসির এন্টিফাংগাল গুণ নেই কোকোপিটের মতো।
৩. সরাসরি কাঁচা গোবর বা কাঁচা গোবর শুকিয়ে ব্যবহার করা যাবে?
উত্তর: বীজ জার্মিনেশন এর জন্য গোবর ব্যবহার করলে গোবর অবশ্যই ৬ মাস থেকে ১ বছরের পুরনো হতে হবে। গোবর ডিকম্পোস্ট করে পরে ব্যবহার করতে হবে এজন্য কাঁচা গোবর ব্যবহার করা যাবে না।
৪. বীজ কত গভীরে বপন করবেন?
উত্তর: সাধারণ নিয়ম হলো, বীজের ব্যাসের ২–৩ গুণ গভীরে বপন করা। খুব ছোট বীজের ক্ষেত্রে মাটির উপর ছিটিয়ে একটি পাতলা স্তর দিয়ে ঢেকে দিলেই যথেষ্ট। অতিরিক্ত গভীরে বপন করলে অনেক সময় অঙ্কুর মাটির উপর উঠে আসতে পারে না।
৫. বর্ষাকালে বীজ অঙ্কুরোদগমের সময় কী করবেন?
উত্তর: বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও উচ্চ আর্দ্রতার কারণে বীজ পচে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বীজতলা বা পাত্র এমন স্থানে রাখুন যেখানে বৃষ্টির পানি সরাসরি পরে না। ছত্রাকজনিত রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ছত্রাকনাশক স্প্রে করুন।
৬. শীতকালে বীজ অঙ্কুরোদগমের সময় কী করবেন?
উত্তর: শীতকালে কম তাপমাত্রার কারণে অনেক বীজের অঙ্কুরোদগম ধীর হয়ে যায়। এ সময় টিস্যু পেপার পদ্ধতি বা কোকোপিট ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। বীজের পাত্র উষ্ণ স্থানে রাখুন এবং আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য পাত্র পলিথিন ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দিন।
